২০১০ সালের শেষের দিকে কাজী মামুন বললেন, “তাহমিদের সময় হয়েছে এবার একটি বই বের করার”। একটা পান্ডুলিপি তৈরি করলাম, অনেক কবিতা। মোটে পনেরটা মতন কবিতা নিজের পছন্দ হল যেগুলো দিয়ে বই করা যাবে বলে আমার মনে হল। তাই বাদ দিলাম, বই করা বাতিল। ১৫টা কবিতা দিয়ে তো আর বই হয় না। তবু মাঝে মাঝে এসে হুংকার দিলাম, “আমার বই বের হচ্ছে, আমার বই বের হচ্ছে”। কিন্তু বই বের করলাম না। ২০১১ সাল গেল, ২০১২ সাল এল। আবার শুরু হল, বই বের করা হোক, বই বের করা হোক। এবার প্রথম কথায় নাকচ। যখন সবাই নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে নিজের বই বের করছে তখন আমার কাছে কবিতা স্টল ৩ বের করাই শ্রেয় মনে হয়েছে। সেদিন আমার কিছু কবিতা পড়তে পড়তে সুবীরদা বললেন, “আপনার কাব্যগ্রন্থ নেই”? আমি বললাম, “না নেই”। তিনি আবার বললেন, “এবার মনে হয়...”। আমি হাসলাম। মনস্থির করেছি, সামনে বছর না, পরের বছরও না। তবু রানা ভাইয়ের সাথে দেখা হওয়ার পর অভিযোগ করলেন, “তাহমিদ তো বই বের করার জন্যে পাগল”। এই চান্সে মিয়াজী ভাই বললেন, “পিয়াস মজিদ আমার বিশেষ পরিচিত, আমি বললেই বই বের হয়ে যাবে, করবেন?” এর উত্তর রানা ভাই আমাকে দিতে দেননি সেদিন। কিন্তু এখন নিচের লেখাটি পড়াতে তো সমস্যা নেই।
http://rongon1971.blogspot.com/2012/03/blog-post_4820.html#!/2012/03/blog-post_204.html
কবিতা স্টল বের করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আমার মত যারা তরুণ, ভাল লিখছে তাদের লেখা প্রকাশ করা। আমি নিজে চেয়ে সেই লেখা ছেপেছি। আমার মনে হয়েছে অসংখ্য প্রতিভাবান তরুণ আমাদের আছে যারা অল্প কিছু পরিচর্যা পেলে একদিন ঠিকই নতুন জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ হতে পারবে। আমি নিজে তরুণ তাই হয়ত তরুণদের ভাল বুঝতে পারি।
আমি একদিক দিয়ে ভাগ্যবান। বহু উপদেশ এ জীবনে পেয়েছি। যার সাথেই পরিচয় গাঢ় হয়েছে, তাদের ভালবাসাতেই সিক্ত হয়েছি আমি। কিন্তু যে উপদেশটা আমি কখনো পাত্তা দেইনি সেটা হচ্ছে, “ওর কাছ থেকে দূরে থাক, ওর সাথে মিশিও না”। আমি বলি, “একটা সজারুর কাছে থেকেও অনেক কিছু জানার আছে, আর এ তো মানুষ”। আমি যেটা জেনেছি, বিশ্বাস করি সেটা হচ্ছে, সবার কাছ থেকে ভাল জিনিস গ্রহণ করা। এ জিনিসটা অনেকে বুঝে না। ধরেন, একজন মানুষ অনেকের কাছে অপাংক্তেয়। কিন্তু আমি ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করেছি। এর মানে এই নয় যে, আমিও অপাংক্তেয় হয়ে যাব। নিশ্চয় আমি কিছু একটা ভাল জিনিস দেখেছি, সেটা আমার ভাল লেগেছে, আমি কথা বলেছি, এতে সমস্যার কি আমি বুঝি না। রানা ভাই যেমন টিটকারী করে বলে, “তোমার পাঠক তো উমুক”।
কাজীদার সাথে অনেকদিন সাহিত্য সাহিত্য যুদ্ধা খেলা হয় না। মানুষটা কয় থাকে বুঝিনা। রুবিনা আপু একদিন বললেন, “তোমার আর কাজী মামুনের মধ্যে এইজন্যেই এত মিল”। কিন্তু আমার তো শুধু অমিলের কথায় মনে পড়ে। তবে হ্যাঁ একমাত্র এই মানুষটার কথায় আমি মনেহয় অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি। সত্যি কথা বলতে কি তিনি নিজে একজন কবি অথচ তার লেখা আমাকে পড়তে দিয়েছেন খুবই কম। অনলাইনে তার লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায়। আর অন্যদিকে নিজের সহপাঠী মনে করি যাকে, হাসান সুমন, তার লেখা পড়লে হীনমন্যতায় ভুগি। যারা বয়সে একটু বড় তাদের অনেকেই বয়সে একটু যারা ছোট তাদের অনেকের লেখা পড়ে একধরনের হীনমন্যতায় ভুগেন। আমার মধ্যে তা নেই কিন্তু কবি হাসান সুমনের কবিতা পড়লে হীনমন্যতায় ভুগি। তার কবিতা পড়লেই মনে হয়, “ব্যাটা দাড়া এইবার এমন একটা মাস্টারপিস লিখুম না, সবার চোখ ত্যাড়া কইরা দিমু”। এরকম সিচুয়েশনে লেখা আমার কবিতা পড়ে অনেকেরই ভাল লেগেছে।
২০০৯ সালের দিকে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। তখন কতগুলো বাংলা ফোরামে লিখতাম। প্রজন্ম ডট কম, রংমহল ডট কম। রংমহলে আমার কবিতার একটা সংকলনও আছে মনে হয়। এখানে পোংতা লিরিক্স নামে একজন ছিল যে প্রত্যহ আমার নতুন কবিতায় কমেন্ট করে যেত যেগুলো পড়লে খুব ভাল লাগত। তখন একটুখানি সমালোচনার খুব অভাব ছিল। ফলে তার কমেন্ট পাওয়া নিয়মিত হয়ে গেল। অনেকদিন তার ভাল নাম আমি জানতে পারিনি। এর তার কাছে অনেক পরে জানতে পারি তার নাম। সেই থেকে পরিচয় কবি ফয়সল অভির সাথে।
আরেকজন মানুষের কথা বলি। কেউ যদি বলে, বিশটা টাকা দাও তো, আলু কিনব। এমন লোক সাধারনত আমরা এড়িয়েই চলব। কিন্তু আমি এড়িয়ে চলি না। না দিতে পারলে বলি, দিতে পারব না। উনার সাথে কিভাবে পরিচয় এখন আর মনে নেই। তার কবিতা আমার ভাল লাগে। তাতেই তো হল, অন্য কিছু নিয়ে এত ভাবি না। সে লোকটা সরসিজ আলীম। পাতাটি যতই মেজাজ দেখাক, লোকটা বেঁচে থাক।
আরেকটা নাম মনে আসছে ত্রিশাখ জলদাস। প্রথম পরিচয় যখন দাদা ডাকলাম তখন মনে হয় রেগেই গিয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, “জান তোমার বয়েসি আমার একটা ছেলে আছে”। আমি তখন বুঝি নাই পরে মনে হল এইজন্যেই হয়ত বলেছিলেন। একবার একটা গ্রুপে বাংলাদেশ নিয়ে কলকাতার কেউ কটু বাক্য বলায় তিনি এমন ক্ষেপেছিলেন তা দেখার মত। লোকটাকে ক্ষমা না চাইয়ে তবে ক্ষান্ত দিয়েছিলেন।
অরণ্যক টিটোদার কথা না বললেই নয়। আমার কবিতা নিয়ে তার মত প্রশংসা খুব কম জনেই করেছে। কবিতা স্টল বের করার পর তার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা সাহিত্যালাপ হয়েছে। তাকে একবার মজা করে বলেছিলাম, “আমার বউয়ের পর আপনার সাথেই হয়ত এত দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললাম”। আমার খুব ইচ্ছে চিটাগাং যাই এবং তার সাথে একটা সন্ধ্যা সামনা সামনি আড্ডা দেই।
অন্য প্রসংগে যাই, কিছুদিন আগে একজনকে রক্ত দান করলাম। প্রথম অভিজ্ঞতা। নাজলা আপু ফোন দিয়ে বললেন, “রক্ত দিতে পারবা কিনা?” আমি ক্ষীন স্বরে বললাম, “পারব”। গলার সাহস নেই কারণ আমি হাসপাতাল খুব ভয় পাই। সত্যি বলছি। অপরিচিত কেউ হলে এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু নাজলা আপু বললেন, “যাবা কিন্তু নাহলে দেখা হলে মাইর খাবা”। গাপুস গুপুস নাজলা আপা যদি আমারে মাইর দেয় তাহলে আমার একটা হাড়ও আস্ত থাকবে না বলে মনে হল। এই ভয়েই হয়ত রক্ত দিয়ে এলাম। রক্ত দিয়ে কেন জানি না মনটা খুব ভাল হয়ে গেল। গর্বে বুকটা ভরে গেল। এ অনুভূতিটা তো দরকার ছিল! এর বিনিময় নাজলা আপুর প্রেমের উপন্যাসটা কিনাই যায়। :P
দুইদিন ধরে বউয়ের সাথে মন কষাকষি চলল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়টা সবসময় আমারই হয়। এই সুখবোধ নিয়ে এখন বলছি, আহা জীবন! অথচ কয়েকদিন আগেও......। তাই এই তো জীবন।
Friday, April 27, 2012
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment