আধুনিক কবিতার ছন্দ
আধুনিক কবিতার ছন্দকে দুইভাগে ভাগ করব।
১। গদ্যছন্দ ২। মিশ্রছন্দ
গদ্যছন্দ
১। অনেকে গদ্যছন্দকেই আধুনিক কবিতার একমাত্র হাতিয়ার বলে মনে করেন। কিন্তু তা ঠিক নয়। আধুনিক কবিতা মানেই গদ্যকবিতা নয়।
২। বিষ্ণু দে গদ্যকবিতাকে নিয়ে বলেছেন, “আবেগই শুধু এ ছন্দের বেগ নির্দিষ্ট করে এবং দুই ব্যক্তির আবেগের মাত্রা এক চালে নাও চলতে পারে”
৩। অন্ত্যানুপ্রাস ছাড়া যেমন গদ্যছন্দে গদ্যকবিতা লেখা যায় ঠিক তেমনি তা দিয়েও লেখা যায়। আবার টানা গদ্যেও গদ্যকবিতা লেখা হয়। আবার একটি কবিতায় কিছু ছন্দবদ্ধ হয়ে লিখে তারপর কবিতার মত ছোট বড় পংক্তি জুড়ে দেওয়া যায়।
৪। একমাত্র গদ্যছন্দেই মানুষের বাকরীতিতে লেখা সম্ভব। ফলে গদ্যকবিতায় উঠে এসেছে প্রতিদিনের ব্যবহার্য ভাষা।
৫।কাব্যিক গদ্য কখনো কবিতা হয়ে উঠে না কিন্তু গদ্যকবিতা অবশ্যই কবিতা হয়ে উঠবে।
৬। গদ্যকবিতায় ছন্দের মাপজোখ না থাকায় তা অনেকখানি গদ্যগুণ সঞ্চার করে। ফলে এখানেই একমাত্র গদ্য ও কবিতার মাঝে মিলনবন্ধণ করা যায়।
৭। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমাদের মহৎ পাঁচ আধুনিকেরা খুব কমই গদ্যছন্দে লিখেছেন। যদি গদ্যকবিতা মাত্রই আধুনিক কবিতা হত তবে রবীন্দ্রনাথকেই এক্ষেত্রে আধুনিক বলতে হবে। আবু সায়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “আধুনিক বাঙলা কবিত” সংকলনে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা তুলে দেওয়া যাক।
“এখানে নামল সন্ধ্যা। সূর্য্যদেব, কোন দেশে কোন সমুদ্রপারে
তোমার প্রভাত হ’ল?
অন্ধকার এখানে কেঁপে উঠচে রজনীগন্ধা, বাসর-ঘরের
দ্বারের কাছে অবগুন্ঠিতা নববধূর মতো; কোনখানে ফুটল
ভোরবেলাকার কনকচাঁপা?”
(সন্ধ্যা ও প্রভাত)
মিশ্রছন্দ
১। প্রথমেই প্রশ্ন আসে গদ্যছন্দই কি মিশ্রছন্দ? ফরাসি Vers Libre মানে অনেকেই মুক্তছন্দ মনে করেন এবং যেহেতু গদ্যছন্দতে ছন্দের মাপজোখ নেই সেহেতু অনেকে গদ্যছন্দকে মুক্তছন্দ বা Vers Libre মনে করেন। কিন্তু এখানে অর্থের বেড়াজালে পড়ে যায়। কারন ফরাসি Vers Libre যে অর্থে ব্যবহৃত হয় তা মুক্তছন্ধ বললেও আসলে মিশ্রছন্দ বললে প্রকৃ্ত অর্থ ফুটে উঠে। এটা ঠিক Vers Libre কখনোই ছন্দের প্রধান সূত্রগুলোকে মেনে চলে না তবু এর মধ্যে একটি ছন্দ ঠিকই থেকে যায়। এই ছন্দ অনেকটাই কবির মর্জির উপর নির্ভর করে।
২। অর্থাৎ মিশ্রছন্দ আসলে একাধিক ছন্দের মিলিত রূপ।
৩। অবাক করা ব্যাপার এই, ত্রিশের আধুনিকেরা গদ্যছন্দের চেয়ে এই মিশ্রছন্দেই বেশিরভাগ কবিতা লিখেছেন।
৪। প্রকৃ্ত অর্থে রবীন্দ্রনাথ কখনোই মিশ্রছন্দে কবিতা লিখেননি। উনি গদ্যছন্দে কবিতা লিখেছেন। এই অর্থে তাকে আধুনিক বলা যাবে না।
৫। আবার মিশ্রছন্দের কথা আসলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। তিনিই প্রথম প্রচলিত ছন্দের বাইরে এসে কাব্যরচনা শুরু করেন। বাঙলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ আর মুক্তক তারই সৃষ্টি। এদিক দিয়ে বলতে হয়, মাইকেলেই আধুনিকতার শুরু।
জীবনানন্দ দাশের “ঝরাপালক” কাব্যগ্রন্থে “শরীরের ঘ্রাণ” কবিতাটি উদাহরন হিসেবে নেওয়া যাক।
আহলাদে অবসাদে/ভরে আসে আমার শরীর
৮+১০
চারিদিকে ছায়া-রোদ-/খুদ-কুড়ো কার্তকের ভিড়ঃ
৮+১০
চোখের সকর ক্ষুধা/মিটে যায় এইখানে,/এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান
৮+৮+১০
পাড়াগাঁর গায় আজ/লেগে আছে রূপশালী/ধানভানা ধূপসীর।
৮+৮+১০
আমরা জানি, মহাপয়ার ৮+১০ ছন্দে লেখা হয়। সেদিক দিয়ে প্রথম দু’লাইন অবশ্যি অক্ষরবৃত্তের পয়ার। কিন্তু পরের দুলাইন তিনি প্রচলিত নিয়মের বাইরে এসে আরো একটি বাড়তি ৮ মাত্রা পর্ব দিয়েছেন।
হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত “আধুনিক বাঙলা কবিতা” থেকে বিষ্ণুদের “অন্বিষ্ট” কবিতাটি নেওয়া যাক। কবিতার প্রথমদিকের কিছু লাইন (৯-১৫) উদ্ধৃতি করছি,
“দিনান্তে আমার সঙ্গী সূর্যাস্ত আকাশ
৮+৬
কিংবা ভোরে আরম্ভের মুক্তির আভাস এই কর্মময় বেগার্ত সুনীলে
৮+৮+৮+২
কাকে-চিলে-শালিকে-টিয়ায়
৮+২
ট্রামে-বাসে পায়ে-পায়ে গ্রামান্ত-শহরে-কলে-মিলে
৮+৮+২
ঘনিষ্ঠ প্রহরে এই আনন্দ জঙ্গম
৮+৬
মেঘে-মেঘে গতির স্থিতির মিলনে সন্তাপে
৮+৬
বাষ্পে-বাষ্পে ছাপে রঙে রঙে আমাদেরও চিদম্বরম”
৮+৮+২
বোঝা যাচ্ছে কবিতার এই অংশুটুকু অক্ষরবৃত্ত।
কবিতাটির আরেকটি অংশ (৩১-৩৬) নেওয়া যাক।
“আমারও অন্বিষ্ট তাই
৪+৪+২
অণুর সংহতি
৬
আসুক জীবনের রঙে মানবিক আমি চাই আমরা সবাই
৭+৬+৪+৬
সূর্যাস্তে ও সূর্যোদয়ে ইন্দ্রধনু ভেঙে দিই জীবনে ছড়াই
৬+৫+৭+৭
হে সুন্দর বাঁচার বিস্ময়ে বিষাদে সম্ভ্রমে জীবনে আকাশ
৫+৭+৭+৬
অবকাশ বাঁচার আনন্দ চাই”
৭+৬
আমার যেভাবে ভাংতে সুবিধে হল সেভাবে ভেংগে দিলাম। বিশেষঙ্গরা আপত্তি জানাতে পারে তবে বুঝা যাচ্ছে এটা মাত্রাবৃত্ত।
এবার আরো কিছু লাইন (৭৮-৮২) নেওয়া যাক।
“আমার হৃদয় এক আকাশের একটি হৃদয়
৪+৪+৪
অনেকের এক পরিচয়
৪+৪
ধমনীতে শালের আবেগ লালমাটি রক্তে বয়
৪+৪+৬
শিরস্ত্রাণ আকাশের হাওয়া
৬+২
সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় আমার দু-চোখে”
৭+৫
এখানেও আমার যেভাবে ভাংতে ইচ্ছা হল ভেংগে দেখালাম। হয়ত আইডিয়ালভাবে ভাংতে পারলাম না। তবু ধরা যায় এটি স্বরবৃত্ত।
এখানে দেখা যাচ্ছে, এক কবিতায় তিন ধরনের ছন্দই ব্যবহৃত হয়েছে।
উত্তরাধুনিক কবিতার ছন্দ
আমি এখন পর্যন্ত আধুনিক আর উত্তরাধুনিক কবিতার ছন্দের পার্থক্য খুঁজে পাইনি তবে বিষয় আশয়ে রয়েছে পার্থক্য। অভিজিৎ চৌধুরীর “পাখিরালয়” কবিতাটির মতই উত্তরাধুনিক কবিতা।
“আমি এক যাদুকরের কাছে কিছু সাংকেতিক ভাষার অর্থ শিখেছিলাম
এবং বাড়ি এসে দেখলাম আমার বাবা, মা, স্ত্রী এবং সন্তানেরা
আপাত নিরীহ শব্দগুলি সংকেতের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে
ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে, ফলে আমি একা হতে লাগলাম
যেহেতু আমি একা থাকতে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই এবং দুঃখকেও
আবার যাদুকরের কাছে গেলাম, আমায় দেখে
সে বলল, ‘তোমায় এবার আমি সংকেতের ভাষা উপেক্ষা
করতে শেখাবো, কথোপকথন তখন থেকে আমায়
আর কষ্ট দেয় না, শব্দের ইশারা বুঝতে না পারায়
পৃ্তহিবীতে পাতলা কুয়াশার মতন লাগে, মনে হয়
আমি যেন এক পাখিরালয়ে রয়েছি, সারাদিন
শুধু কিচির-মিচির, কিচির-মিচির...”
Thursday, February 3, 2011
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
1 comment:
অনেক ভালো লাগলো
Post a Comment