Friday, January 21, 2011

ছন্দের সাতকাহন ২

তিন প্রধান ছন্দ

সাধারনত ছন্দকে যে কভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে সেগুলোকে আমি সনাতনী ছন্দ বলব। এভাবে ছন্দ তিন প্রকার।

১। অক্ষরবৃত্ত
২। মাত্রাবৃত্ত
৩। স্বরবৃত্ত

অনেক ছন্দকার বিভিন্ন নামে এই ছন্দগুলোর নাম দিয়েছেন। প্রবোধচন্দ্র সেনের নামকরন দেওয়া যেতে পারে।

১। অক্ষরবৃত্ত - মিশ্রবৃত্ত
২। মাত্রাবৃত্ত – কলাবৃত্ত
৩। স্বরবৃত্ত – দলবৃত্ত

বাকি যারা এই তিনটি ছন্দের নামকরন করেছেন তা আমাদের কাছে খুব প্রচলিত না হওয়ায় তা উল্লেখ করার প্রয়োজনবোধ করছি না।

এই তিন ছন্দ জানার আগে কিছু বিষয় জেনে নেই।

মাত্রাঃ আমরা যা দিয়ে ছন্দকে পরিমাপ করি বা বুঝতে পারি এটা কোন ছন্দ তাই মাত্রা।
পর্বঃ একটি কবিতা পাঠে যে সময় কিছু বিরতি পড়ে তাই পর্ব।
সিলাবেলঃ একে সিলাবেলই বলা ভাল। বাংলা নিয়ে অনেক সমস্যা। এটা দুধরনের ওপেন এবং ক্লোজড সিলেবেল। এখানে একটু উদাহরন দেয়া জরুরী মনে করছি। তাহলে আমাদের পরে সুবিধে হবে। একটা শব্দ নেয়া যাক। যেমন, মধ্যে সিলেবল করে ভাংগলে হয় মধ্+ ধে। প্রথমটি ক্লোজড সিলেবল আর দ্বিতীয়টি ওপেন।
চরণঃ এক বা একধিক পর্ব নিয়ে একটি চরণ হয়।

অক্ষরবৃত্ত

১। লেখার সময় যে যেভাবে মাত্রাগুলো আসে

৪+২=৬
৪+৪+২=১০
৪+৪+৪+২=১৪
৪+৪+৪+৪+২=১৮

আরো হতে পারে

৪+৪+৪+৪+৪+২=২২
৪+৪+৪+৪+৪+৪+২=২৬
৪+৪+৪+৪+৪+৪+৪+২=৩০
এখানে প্রত্যেকটি একটি মাত্রা আর যেভাবে ভাগ করা হয়েছে সেগুলো এক একটি পর্ব

২। এই ছন্দ চিনব বর্ণ সংখ্যা গুনে। অর্থাৎ একটি বর্ণ একটি মাত্রা হিসেবে ধরব।
৩। যুক্তাক্ষরগুলোকে একটি বর্ণ হিসেবে ধরব এবং একটি মাত্রা হিসেবে গণনা করব।
৪। অক্ষরবৃত্ত বর্ণের সংকোচন মেনে নেয়।
৫। ৪/৪/৪/২ কে ৮/৬ হিসেবেও গণনা করা যায়। এভাবে অন্যগুলোও গণনা করা যাবে।

কবিতা নিয়ে অ্যানালাইসিস করার আগে আমরা শব্দ নিয়ে আলোচনা করি। উপরের নীতি গুলো শব্দের সাথে মিলিয়ে নিন।

আলোঃ দুমাত্রা
অক্ষরঃ তিন মাত্রা (যুক্তাক্ষরটি একমাত্রা হয়েছে)
খাইয়াঃ তিন মাত্রা (আবার চলিত খেয়ে হবে দুমাত্রা)
দূর্দান্তঃ তিন মাত্রা (উচ্চারন দূর+দা+ন্ত হলেও এটি অক্ষরবূত্তে তিন মাত্রায় হবে)
দুঃসাধ্যঃ তিন মাত্রা
সিন্ধান্তঃ তিন মাত্রা (দুটি যুক্তাক্ষর এসেছে তবে তা তিন মাত্রাই হবে)
ফাগুনেরঃ চার মাত্রা (ফা+গু+নের এতে নের সংকুচিত করে ফেললে তিন মাত্রা)
বসুন্ধরাঃ চার মাত্রা
উৎপীড়নঃ চার মাত্রা
তারপরঃ চার মাত্রা (তার্পর ধরলে তিন মাত্রা)
হাতরাতেঃ চার মাত্রা (হাত্রাতে ধরলে তিন মাত্রা)
বুলবুলিঃ চার মাত্রা (বুল্ সংকোচিত করে তিন মাত্রা)
হা্তিরপুলঃ পাঁচ মাত্রা (হাতির্পুল ধরলে চার মাত্রা)
ভাল লেগেছেঃ পাঁচ মাত্রা (ভাল্লাগেছে ধরলে চার মাত্রা)

অনেক সময় পর্ব ভাংগতে গিয়ে শব্দের মাঝে ভেঙ্গে যায়। যেমন

“আমাদের দেয়ালে লালচে দুটি ছোঁয়া”
(লাইনের অর্থ কি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়)

এটাকে ভাংলে কি হবে?

“আমাদের/ দেয়ালে লা/লচে দুটি/ ছোঁয়া”

এরকম বেজায়গায় ভাংগলে অনেক সময় শ্রুতিমধুর হয় না।

তাই অক্ষরবৃত্ত সাজাতে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন “বিজোড়ে বিজোড় গাঁথ আর জোড়ে গাঁথ জোড়”


মাত্রাবৃত্ত

১। অনেক ক্ষেত্রেই মাত্রাবৃত্ত কে অক্ষরবৃত্তের বিপরীত ধরা হয়।
২। অক্ষরবৃত্ত আমরা চিনেছি বর্ণ গুনে কিন্তু মাত্রাবৃত্তে আমরা ধ্বনির উচ্চারন দিয়ে মাত্রা নির্ধারন করব।
৩। এখানে অবশ্যি যুক্তাক্ষরকে দুমাত্রা ধরতে হবে।
৪। অক্ষরবৃত্ত যেমন বর্ণের সংকোচন মেনে নেয় তেমনি মাত্রাবৃত্ত ধ্বনির বিভাজন মেনে এগোয়।
৫। কোন শব্দের মাঝে বা শেষে থাকাও সত্ত্বেও যদি পূর্ববর্তী বর্ণটিতে হসন্ত থাকে তবে যুক্তাক্ষরটি এক মাত্রার হবে।
৬। মাত্রাবৃত্তে পর্বগুলো ৪,৫,৬,৭ এমনকি কখনো কখনো ৮ মাত্রার হতে পারে।

আবারো কিছু শব্দ নেয়া যাক। প্রথমে অক্ষরবৃত্তে উদাহরন দেওয়া কিছু শব্দ নেওয়া যাক নতুন শব্দের পাশাপাশি।

অক্ষরঃ অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা কিন্তু মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা।
দূর্দান্তঃ অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা কিন্তু মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা।
সিন্ধান্তঃ অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা কিন্তু মাত্রাবৃত্তে পাঁচ মাত্রা।
সান্ত্বনাঃ চার মাত্রা। (সা+ন+ত্ব+না)
ব্যাঘ্রঃ তিন মাত্রা। (ব্যা+ঘ+রো)
মৈত্রীঃ তিন মাত্রা(ম+ই+ত+রী হিসেবে চার মাত্রা হওয়ার কথা, প্রথমে যুক্তস্বরের আধিক্য থাকায় মই+ত+রী হয়ে তিন মাত্রা।

স্বরবৃত্ত

১। স্বরবৃত্ত ছন্দের মাত্রা ধরব সিলেবল অনুযায়ী। প্রত্যেক সিলেবল একটি মাত্রার যোগ্যতা পাবে।
২। সিলেবল অনুযায়ী মাত্রা হয় কম।

উপরের উদাহরনের শব্দগুলো থেকে শব্দ নেয়া যাক।

অক্ষরঃ অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে দুই মাত্রা (অক্+খর)।
ছন্দঃ অক্ষরবৃত্তে দুই মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে তিন মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে দুই মাত্রা (ছন্+দ)
তিন চারঃ অক্ষরবৃত্তে চার মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে দুই মাত্রা। তিনটি ক্লোজড সিলেবল।
কর্পূরঃ অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে তিন মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে দুই মাত্রা। দুটি ক্লোজড সিলেবল।

2 comments:

Mohammed Abdulhaque said...
This comment has been removed by the author.
Mohammed Abdulhaque said...

আপনি কি আলো ব্লগের তাহমিদুর রহমান